সেনাবাহিনীর হেফাজতে মৃত এনএলডি নেতা খিন মং লাট ও জ মিয়াত লিন। ছবি : সংগৃহীত

বার্মার  সেনা হেফাজতে সু চির দলের দুই নেতার ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু

বার্মার সামরিক জান্তা সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর হাতে ৮০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি অং সান সু চির দল এনএলডির আটক দুই নেতার মৃত্যুর খবরে দমনপীড়নের মাত্রা কতটা তা পরিষ্কার হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।

১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখলের পর থেকে অং সান সু চিসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের গৃহবন্দি করে রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। মার্চের শুরুতে একই দিনে ৩৮ জন নিহত হয়। মধ্য ইয়াঙ্গুনের পাবেদান এলাকায় ব্যাপক নাটকীয়তা দেখা দেয়। সেখানে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে স্থানীয়রা। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিমদের নিয়ে নানা ধর্মবর্ণের মানুষের বাস পাবেদান এলাকায়। এলাকাটিতে আটটি মসজিদ রয়েছে।

গত জাতীয় নির্বাচনে এনএলডির দুজন মুসলিম প্রার্থীর একজন সিথু মং পাবেদানে জয় পান। সিথু মংয়ের নির্বাচনি ব্যবস্থাপক খিন মং লাট মার্চের শুরুতে সেনাদের হাতে আটক হওয়ার পর মারা যান। ১৯৮৮ সাল থেকে তিনি এনএলডি করতেন। স্থানীয় কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন খিন মং লাট।

এনএলডির সংসদ সদস্য সিথু মং অজ্ঞাত স্থান থেকে বিবিসিকে বলেন, ‘খিন মং লাট খুবই ধর্মভীরু ছিলেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। সব ধর্মের মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর। এনএলডির জন্য তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।’

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, রাতের অন্ধকারে খিন মং লাটের বাড়ির দরজা ভেঙে তাঁকে মারধর করে তুলে নিয়ে যায় সেনা সদস্যরা। পরদিন সকালে ইয়াঙ্গুনের সামরিক হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে আসে পরিবার। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কথা বলা হলেও ৫৮ বছর বয়সী এই নেতা একেবারে সুস্থ ছিলেন বলে জানায় পরিবার। অথচ মরদেহে প্রচুর আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

অন্যদিকে, খিন মং লাটের ঘটনার দুদিন পর ইয়াঙ্গুনের শে পি থর এলাকার এনএলডি গুরুত্বপূর্ণ নেতা জ মিয়াত লিনেরও (৪৬) একইভাবে মৃত্যু হয়। শিল্প এলাকাটির একটি কারিগরি কলেজের শিক্ষক ছিলেন তিনি।

সেনাবিরোধী বিক্ষোভে ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় সক্রিয় ছিলেন জ মিয়াত লিন। আটক হওয়ার আগের দিনগুলোতে ফেসবুকেও বেশ সরব ছিলেন তিনি। তরুণদেরকে সেনা সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাতেন। ওইসব পোস্টে তিনি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ‘কুকুর’ এবং ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিতেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এনএলডি নেতা বিবিসিকে বলেন, ‘জ মিয়াত লিন তুখোড় বক্তা ছিলেন। নিজের এলাকায় সেনাবিরোধী প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তাঁর আহ্বানে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি আনুগত্য ভাঙার আন্দোলনে সাড়া দেন।’

নির্বাচনে কথিত জালিয়াতির অজুহাত তুলে দেশটির সেনাবাহিনী গত ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সু চির নির্বাচিত সরকার উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। একই সঙ্গে সু চিসহ দেশটির বেসামরিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করে। সেনা অভ্যুত্থানের পরপরই দেশটির গণতন্ত্রপন্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। সেনা শাসনবিরোধী এই বিক্ষোভে জান্তার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এখন পর্যন্ত আট শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অনেকে। এ ছাড়া হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য