রাজনৈতিক দলের ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের বাধ্য-বাধকতা নেই

রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশ করার বাধ্য-বাধকতার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছর (২০২০)। তবে সেই পর্যন্ত দেশের নিবন্ধিত কোনও রাজনৈতিক দলই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল শর্তপূরণের জন্য আরও সময় চেয়েছে। অবশ্য নির্বাচন কমিশনও সময় আরও ১০ বছর বাড়িয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২’র সংশ্লিষ্ট ধারায় সংশোধনী এনে সরকারকে পাঠিয়েছে। তবে, কোনও আইনই প্রনয়ণে এখনও কোনও অগ্রগতি নেই। এদিকে নির্বাচন কমিশন বলেছে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার শর্ত থাকলেও এটি বাধ্যবাধকতা নয়, ঐচ্ছিক বিষয়। এটা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন উল্লেখ করে ইসি বলেছে, তারা এটা কারও ওপর চাপিয়ে দিতে চায় না। রাজনৈতিক দলগুলো যদি মনে করে এটা থাকবে।

২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ে কমিটিতে নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশ করার করাসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি নিয়ে ২০০৮ সালে ইসির নিবন্ধন পায় রাজনৈতিক দলগুলো। অন্য শর্তগুলোর মধ্যে ছিল বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ইসিতে জমা দেওয়া, ছাত্র-শ্রমিক বা পেশাজীবী সংগঠনকে দলের সহযোগী সংগঠনের মর্যাদা না দেওয়া ইত্যাদি। এসব শর্তগুলোর মধ্যে অন্যগুলো পূরণ হলেও নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি সময়মত বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

রাজনৈতিক দলের নারী নেতৃত্বে বিষয় আরপিওতে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনও রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত হতে চায়, তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলোর মধ্যে একটি পূরণ করবে— কেন্দ্রসহ সব পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের জন্য কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং ধারাবাহিকভাবে ২০২০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।’

২০২০ সালের সময়সীমা চলে গেলেও হাতে গোনা দু-একটি দল ছাড়া কেউ ২০ শতাংশেরও বেশি নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। এ অবস্থায় কমিশন রাজনৈতিক দল থেকে মতামত নিয়ে আইন সংশোধন করে ২০৩০ সাল করার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আইনটি কয়েক দফা চালাচালি করে এখন ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

বর্তমানে রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্বের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২৪ শতাংশের কম নারী রয়েছে। সংগঠনের তৃণমূল পর্য়ায়ে এই চিত্র আরও ভয়াবহ।

বিএনপির ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর যে কমিটি ঘোষণা করে তাতে ৫২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে নারী রয়েছেন ৬৮ জন (১৩ শতাংশ)। অবশ্য আরপিওর শর্তপূরণ বিষয়ে ২০১৭ সালে নির্বাচন কমিশনে যে চিঠি দিয়েছিল তাতে জানিয়েছে দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ১৫ ভাগ নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিতে বর্তমানে নারী নেতৃত্বের হার কম বেশি ১০ শতাংশ। অবশ্য দলটি ইসির চিঠির জবাবে জানিয়েছিল তাদের দলের নারী নেতৃত্ব ২০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য দলের মধ্যে সিপিবিতে ১৩.৩৩ শতাংশ ও জাসদে, ১১.৯২ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে।

এদিকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল গণফ্রন্ট জানিয়েছে, তাদের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। ইসিতে দেওয়া তথ্যের আলোকে এনপিপির ২০ শতাংশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ৬, গণতন্ত্রী পার্টিতে ১৫ শতাংশ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ১ নারী নেতৃত্ব রয়েছে। জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) ১০১ সদস্যের কোর কমিটিতে ১৬ জন নারী। অর্থাৎ কমিটিতে নারী আছেন ১৫.৮ শতাংশ। লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলিডিপির) কমিটিতে নারী আছে ২২ শতাংশ। তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর গড়ে ৩-৪টি করে নারী উইং রয়েছে। যাদের শতভাগই নারী নেতৃত্ব রয়েছে।

রাজনৈতিক দলের নারী নেতৃত্বে নিশ্টিত করার বিধানে বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনে বলা আছে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চেষ্টা করবেন। এটা ম্যান্ডেটরি কোনও ক্লজ নয়। এটা অপশনার একটি ক্লজ। তারা (রাজনৈতিক দল) এটা কতটুকু করতে পেরেছে। এটা আদৌ করা সম্ভব হবে কিনা? এই অপশনাল ক্লজটির কতটুকু প্রয়োজনীয়তা আছে-সব কিছুর বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল বা সরকার যদি মনে করে এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তাহলে উনারা রাখবেন। বা উনারা আরো সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সাল বা ২০৩৫ সাল করার প্রয়োজনীয়তা মনে করেন তাহলে এটা এক্সটেন করবেন। এটা হতে হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমরা ইচ্ছা করলে নির্বাচন কমিশন থেকে চাপিয়ে দেওয়াটা কোনোক্রমেই ঠিক হবে না। কমিশন কিন্তু এই আইনটি তৈরি করেছে। এটা সরকারের আইন। আমরা কেবল মতামত দিয়ে বাস্তব অবস্থারা উনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি।’

কমিশনার কবিতা খানম বলেন,  ‘২০১৮ সালে আমরা রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্বের সর্বশেষ অবস্থার তথ্য নিয়েছিলাম। সেখানে প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলেও বৃদ্ধির প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করেছি। আমরা ২০২১ সালে তথ্যগুলোর থেকে আবার তথ্য সংগ্রহ করবো। এটা পাওয়ার পর সর্বশেষ পরিস্থিতি বিস্তারিত বলতে পারবো।’

শর্তের সময় পার হলেও আইনি ব্যতয় হচ্ছে না দাবি করে এই কমিশনার বলেন, ‘আইনটি এখনও না হলেও আইনটির প্রস্তাব আমরা সরকারের কাছে করেছি। সেই প্রস্তাব তো নাকচ হয়নি। যতক্ষণ নাকচ না হবে ততক্ষণ তো আমরা বলতে পারি না যে এটা আইনের বাইরে চলে গেছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তারা আরপিওর সংশোধনী কমিশন অনুমোদন দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সংশোধনী প্রস্তাবনায় নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশের বিধান ২০২০ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সাল প্রস্তাব করা হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য